+
জয় দয়াময়
১। সোজা কথা এই, নাম বিনা সম্বল নাই, সাধন বিনা পথ নাই এবং ঈশ্বর বিনা উপাস্য নাই।
২। অগ্রে গুরু অন্বেষণ করিবে ও তাঁহার সহিত সানন্দে ঈশ্বর খুঁজিবে। জানিবে, শ্রীগুরু তোমাকে অন্তরের সহিত কৃপা করিলেই ধর্ম্মের পথ সহজে প্রাপ্ত হইবে।
৩। সচরাচর সিদ্ধমহাপুরুষেরাই আমাদের গুরু হইবেন এমন কোন কথা নাই; যাহাদের উপর তাঁহারা ভার অর্পণ করেন, তেমন লোকও আমাদের শিক্ষক হন এবং উপদেশ করিয়া থাকেন। ছাত্রের কর্ত্তব্যা-কর্ত্তব্য যাহারা বুঝিতে পারেন, তাহারাই সাধনপথ আমাদিগকে প্রদর্শন করিতে পারেন এবং উপদেষ্টার আসনে তাহাদিগকে আমরা বরণ করিতে পারি।
৪। যাহাদের জীবন উন্নত নয়, যাহাদের মধ্যে সত্যের আলোক ফুটিতেও পারে নাই এবং যাহাদিগকে ধর্ম্মের অধিকারী বলিয়া জানিতে পারি না, এরূপ মানুষের উপদেশ মানিয়া চলা আবশ্যক নাই।
৫। সিদ্ধগুরু জগতে বিরল। সুতরাং সাধনের কার্য্য যেখানে মিলে সেখানেই উপদেশ নিবে, কোন ক্ষতি হইবে না। জাতি ও ধর্ম্ম নিয়া বিরোধ নাই, সত্যই জীবনের সার লক্ষ্য ভূমি।
৬। পূর্ণসিদ্ধির নিমিত্তই আমরা সাধন করি। এই সাধন অদ্য কেহই লাভ করেন নাই। আমরা জানি, দয়াময় নাম নিয়া কার্য্য করিলেই ইহার প্রতিষ্ঠা হইবে এবং জগতের যোগে রাজ্য লাভ ঘটিবে।
৭। অগ্রে যাহারা চলিতেছেন, তাঁহাদের উপদেশ নিয়া সাধন ভজন করাই ধর্ম্মের সর্ব্বোত্তম পথ। হইতে পারে, তোমার জীবনে অনেক গুরুর প্রয়োজন আছে; সুতরাং যে উদ্দেশ্য নিয়া চলিতেছ, সে উদ্দেশ্যের হিসাব কখনো ভুলিও না। ধর্মই জীবনের লক্ষ্য করিবে, ঈশ্বর ভিন্ন কাহারো প্রতি দৃষ্টি রাখিবে না, Ñতাঁহাকেই আদর্শ জানিবে।
৮। বস্তুতঃ সিদ্ধ গুরু মনের অন্ধকার দূর করেন, যে সত্য জীবন্ত, জাগ্রত ও প্রত্যক্ষ তাহার প্রতিষ্ঠা করেন।
৯। যিনি মানুষের অন্তরে সর্ব্বতত্তে¡র অধিকার সঞ্চারিত করিতে পারেন, যাঁহাকে পাইলে মানুষের অন্তরে সর্ব্বব্যাপী করুণাময় পরমেশ্বর প্রকাশিত হন ও জগত সাধন পূর্ণ হইতে পারে, তাহাকেই গুরু বলি।
১০। সর্ব্বোত্তম মীমাংসা এই যে, আমরা উপদেশ নিয়া চলিব এবং যাঁহার উপদেশ নিলে মন-প্রাণ অল্পে অল্পে স্থির হইতে থাকে ও জগতের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া আমরা চলিতে পারি, তাঁহাকেও গুরু মনে করিব।
১১। সত্য ভিন্ন ঈশ্বর নাই, ঈশ্বরেতর সত্য নাই, ইহাই প্রকৃত কথা স্মরণ রাখিবে।
১২। সত্যই পরমেশ্বর তিনিই উপাস্য ও উপাসক ভেদে কার্য্য করিতেছেন এবং এক ঈশ্বরের ইচ্ছাই সতত সর্ব্বভাবে বিশ্বের সাধনপথ নিয়ন্ত্রিত করিতেছে।
১৩। ঈশ্বর ভিন্ন উপায় নাই তিনি ভিন্ন কার্য্য কর্ত্তা নাই; তাঁহাকে লইয়াই এত মতভেদ ঘটিয়াছে এবং তিনিই আবার সকলকে লইয়া জগতে কার্য্য করিবেন।
১৪। সত্যের জন্যই সাধনা করিবে- উপাসনা করিবে। সত্যে জীবনের প্রতিষ্ঠা না হইলে শান্তি আসিবে না। সুতরাং শান্তি লাভ করাই সার লক্ষ্য জানিবে।
১৫। সাধন করা সহজ নহে। সত্য লাভ সাধনের সর্ব্বশ্রেষ্ঠ ফল। সুতরাং সত্যের জন্য জীবন বিসর্জন করার চেয়ে মহত্তর বিষয় আর নাই।
১৬। যাহাতে জীবনের কোন ত্রওটি বা দোষ না জন্মে, মনের স্বতঃপ্রেরণার মূলে কেবল ধর্ম্ম পিপাসাই জাগিয়া উঠে ও কোনরূপ অবস্থায় আমাদিগকে আবদ্ধ করিতে না পারে, ইহাই আসল সাধনা।
১৭। মান-সম্ভ্রম প্রতিপত্তিতে দিন যাইবে না, জগতের কোন বিষয় সম্পদেও শান্তি হইবে না। নামের চিন্তাই মানুষকে মর্ত্ত্যে অমর করিবে ও সিদ্ধিও সন্ধানে জীবন্মুক্তির পথ বলিয়া দিবে।
১৮। যাহাদের পিপাসা নাই, আত্মীয় জ্ঞানে ঈশ্বরকে যাহারা অন্বেষণ করে না ও সাধনের জন্য যাহারা উৎকন্ঠিত নহে, তাহারা সাধন পাইবে না। মানুষ সর্ব্বস্ব পণ করিবে, উপাসনার মধ্যে আত্মোৎসর্গ করিবে, তবেই সাধন পাইবে।
১৯। সাধন কর আর নাই কর, ভাল বুঝ কিংবা নাই বুঝ, জান বা নাই জান, কেবল বৃদ্ধিই তোমাদের মধ্যে নিয়ত কর্ম্ম নিরত রহিয়াছে।
২০। ঈশ্বর সাধনের মূলমন্ত্র এই যে, জগতে যত বস্তু বা বিষয় আছে, সকলই হৃদয়ে আসিয়া আমাদের ইষ্ট স্ফূর্তি করিয়া দেয় ও অল্পে অল্পে জগতকে করতলে আনয়ন করে। যে ব্যক্তির অভ্যন্তরে যে পরিমিত জগতের যোগ পূর্ণ হইবে, সে ব্যক্তিকে মানুষ সে পরিমাণে উচ্চ অধিকারী মনে করিবে।
২১। যে ভাবে যিনি কার্য্য করুন না কেন, শেষে প্রত্যেকেই এক ঈশ্বরের পথে আসিবে। মঙ্গলময় ঈশ্বর সাধনের সম্যক ফল প্রত্যেকের জন্যই নির্দ্দিষ্ট করিয়াছেন।
২২। সত্য ভিন্ন উদ্দেশ্য যখন আর কিছু নাই, তখন কেহ যেন কোন দিন ধর্মের ভিতরে দলাদলি না করেন। সাধন ভিন্ন কাহারো মধ্যে উন্নতির অবস্থা আসিতে পারে না।
২৩। ধ্যান-ধারণার বলে সদাসর্ব্বদা কার্য্য করিবে যেন অনায়াসে মনের অবস্থা জানা যাইতে পারে ও ঈশ্বরের সহিত একতা আসিতে পারে। তাঁহার নামের গুণেই সাধন লাভ হইবে, হৃদয় মুক্ত হইবে, উন্নতির অবস্থা আসিবে ও জীবনে সম্পূর্ণতা দেখা যাইবে।
২৪। মনের যোগ সম্যক নিরাকরণ উদ্দেশ্যে কেবল নামের প্রতিই বিশ্বাস রাখিবে ও নাম ভিন্ন আর কোন প্রতিকার অন্বেষণ করিবে না।
২৫। সর্ব্বদার নিমিত্ত হৃদয়ে ঈশ্বরচিন্তা প্রবল হইলে আর কোন ভয় থাকে না, সাধনের মধ্যে অনন্ত প্রতিকার নামেই স্থাপিত হইয়া যায়।
২৬। সর্ব্বধর্ম্মের সার ‘প্রকৃত তত্ত¡’ই বস্তুতঃ জগতের তত্ত¡ মীমাংসায় বিশুদ্ধ গ্রন্থ। সুতরাং তাহাই মনের সংশয় ছিন্ন করিবে, ধর্ম্মের সকল বিষয় সংশোধন করিবে।
২৭। দশের কাজে যন্ত্রণা বেশী। বস্তুতঃ সাধনের সঙ্গে সংগ্রামই চির মিত্রতা করিয়া রহিয়াছে।
২৮। স্বার্থশূন্য প্রেরণা ভিন্ন কাহারো অন্তরে শক্তির আবির্ভাব হইতে পারে না। কেহই অভাবের উগ্র তাড়না ভিন্ন পথ প্রাপ্ত হয় না ও লাঞ্ছিত নিপীড়িত বা বিপন্ন না হইয়া ঈশ্বরের সহিত মিলিতে পারে না।
২৯। আমরা জন্ম পরিগ্রহ করিয়াছি ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কার্য্য করিতে। এই কার্য্য দ্বারা আমাদের সকল প্রকারের অভাব অভিযোগ থাকিবেনা; রোগ, শোক এবং মৃত্যুর কারণও আর তিষ্ঠিতে পারিবেনা।
৩০। অনেক রকমের উপদেষ্টা আছেন-গুরু রহিয়াছেন। তাহারা নানা গ্রন্থের শ্লোক জানেন, অর্থ বলেন অথবা দীক্ষালব্ধ মন্ত্র দিতেও পারেন। ইহা দ্বারা কাহারো কাহারো কিয়ৎ পরিমাণে উপকারও দর্শিতে পারে, কিন্তু ঈশ্বর দর্শনাদি জটিল সমস্যার সমাধান ইহা দ্বারা হইতে পারে বলিয়া আমার বিশ্বাস হয় না।
৩১। ধর্ম্মের নিন্দা করিওনা, পারিলে সকল ধর্ম্মের সার সত্যের সাধনে জীবন উৎসর্গ কর এবং জগতের সেবায় প্রত্যেক ধর্ম্ম মতের প্রচার কিংবা প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে কার্য্যে ব্রতী হও। ইহাই সনাতন নীতি-ইহাই পরম কারুণিক পরমেশ্বরের সাধনার বিধি।
৩২। সকলেই এক অনন্ত ঈশ্বরের অখন্ড চিদানন্দ সমুদ্রের বিকাশ ইহা নিশ্চিত কথা। যিনি স্রষ্টা বিশ্ব নিয়ন্তা, তাঁহার শক্তিই সকলের মধ্যে কার্য্য করিতেছে।
৩৩। এক ঈশ্বরই সকল কার্য্য নিয়ন্ত্রিত করিয়া থাকেনÑ তিনিই গোঁড়ায় বিদ্যমান থাকিয়া তাঁহার সৃষ্টির লক্ষ্য-সূত্র বজায় রাখিয়া লীলা বৈচিত্র বিধান কল্পে প্রয়োজনানুসারে দেশ কাল পাত্র ভেদে এক একজন ধর্ম্ম প্রবর্ত্তক উপস্থিত করিয়া থাকেন।
৩৪। সত্যের জন্য সাধন কর এবং শেষ ভূমি না পাওয়া পর্য্যন্ত নীরবে অবিশ্রান্ত গতিতে চলিতে থাক, দেখিবে-কখনও ঈশা, মুশা, কবীর, নানক, শিব, চৈতন্য, বুদ্ধ কিংবা জোরতোস্ত প্রভৃতি জগতের সর্ব্বোচ্চ মহাপুরুষেরা একত্র মিলিত হইলে বিন্দুমাত্র বিরোধ করিবেন না পক্ষান্তরে সকলের সহিত সকলে মিলিয়া ধরিত্রীর জরা মৃত্যুর নানা ভূমিতে অনিন্দ্য সুন্দর স্বর্গের প্রতিষ্ঠা করিবেন।
৩৫। সাধন করিতে গেলে এবং সকল ধর্ম্মের নিগূঢ় তত্ত¡ জানিয়া সকলের কল্যাণ কল্পে কার্য্যে ব্রতী হইলে অশেষ ভক্তি, শ্রদ্ধা ও বিনয়াদি সদগুণের অধিকারী হওয়া প্রয়োজন।
৩৬। সংসারে সুখী হইবার নিমিত্ত কিংবা ঐশ্বর্য্য ভোগের জন্য অথবা অপর কোন বৈষয়িক সম্পদের সঙ্কল্প মনে রাখিয়া বাঁচিতে চাহিও না। বাঁচিবে ধর্ম্মের জন্য জগত মুক্তির নিমিত্ত।
৩৭। ‘কাম’ আর ‘প্রেম’ এক বলিয়া গণ্য করা উচিত নহে। যেখানে প্রেম সেখানে কাম থাকিতে পারে না। একত্র দুইটি বিপরীত বস্তুর অবস্থান অসম্ভব হইবে। আমরা সর্ব্বদাই দেখিতেছি, রাত্রি দিবা হয় না, অমাবস্যা পূণিমা হয় না। প্রেমও কাম হইবে না, কামও প্রেম হইতে পারে না।
৩৮। “দয়াময়” নাম লইয়া সংগ্রাম করিতে থাক, ধর্ম্মের পথে অকপট অন্তরে সাধন প্রাপ্তির মানসে সকল স্বার্থে কুঠারাঘাত কর এবং যাহাতে জীবন মুক্তির পথে নিষ্কলঙ্ক প্রেম-সূর্য্য সমুদিত হয়, তন্নিমিত্তে জীবনপাত কর। নাম ও ঈশ্বর এক, সুতরাং নাম করÑ প্রেম লাভ হইবেই হইবে।
৩৯। যেমন সাধন করিবে, তেমন সুবিচার বলে হিসাব করিবে এবং মর্ম্ম জানিয়া লইবে। তুমি সংকুচিত মন লইয়া সাধন করিও না সংস্কার বদ্ধ জীবনের ষোল আনা বিষয় অটুট রাখিয়া কার্য্য করিও না। জানিও সাধনের কার্য্য অল্প বিদ্যায় হইতে পারে না বুদ্ধির কূট জালেও ইহার সাধ্যযোগ পাওয়া যায় না।
৪০। সংসার চিন্তা প্রয়োজন। সকল মনুষ্য অন্ন-বস্ত্রের জন্য কার্য্য করে। পরিণামই কার্য্যরে প্রসূতি। এই জন্য সর্ব্বাগ্রে জ্ঞানের দ্বার খুলিবে।
৪১। জ্ঞান বাহিরে নাই। সাধক দেখেন, যাহা ভাবনা করা যায়, মানুষ তাহা হয়। চিন্তা করিলে জটিল তত্ত¡ও উপলব্ধি হয়। এই জন্য একাগ্র হওয়া প্রকৃত পথ। যোগও একাগ্রতা। ছাত্রদের মঙ্গল চিরদিন এই স্থানে আবদ্ধ।
৪২। যিনি জ্ঞানী, তাঁহার সঙ্গ করিবে। যে ভাবে তিনি কার্য্য প্রণালী প্রদর্শন করেন, অনন্য মনে তাঁহার অনুসরণ করিবে। ইহাতে শরীর সুস্থ, হৃদয় রস প্রবণ হইবে।
৪৩। ছাত্রগণ, তোমরা শান্তি চাও। বিত্ত, অর্থ, প্রয়োজনীয় সকল বস্তু হৃদয়ের শক্তিতে লাভ হয়। এই শক্তি ঈশ্বর দিয়াছেন। মন কেন্দ্রীভূত কর জগৎ মনশ্চক্ষুতে প্রতিভাত কর দেখিবে, সর্ব্বশক্তি ভিতরেই বিদ্যমান। ধ্যান শিখ- আনন্দে তন্ময় হও।