Notice Hotline:01787612121Visitor Count: 21731

শ্রী কামিনী কুমার দত্ত মজুমদার জীবনী:

শ্রী কামিনী কুমার দত্ত মজুমদার ও দত্ত বংশ। কুমিল্লা জিলার দেবীদ্বার থানার অন্তর্গত বিহারমন্ডল গ্রামে ১৩০৫ বাংলা সনে ১৭ই ফাল্গুন মঙ্গলবার শ্রী কামিনী কুমার দত্ত মজুমদারের জন্ম হয়। এই গ্রামের নামাকরণ সম্পর্কে কামিনী বাবু একদিন উনার পরমারাধ্য গুরুদেব শ্রীশ্রীমৎ লব চন্দ্র পাল মহারাজের মুখে যাহা শুনিয়াছেন তাহা নি¤েœ প্রদত্ত হইল। তিনি বলিলেন, “অতি প্রাচীনকালে এই গ্রামে বৌদ্ধ বিহার ছিল তদনুসারেই এই গ্রামের নাম বিহারমন্ডল বলিয়া কথিত হয়।” তিনি আরও বলিলেন, “ আমাদের বশত বাড়ীর উত্তর পশ্চিম কোণে কোন এক জঙ্গলপূর্ণ স্থানে একটি বটগাছ আছে। এই গাছটি অন্য কোন গাছকে আশ্রয় করিয়া জন্মিয়াছিল। এই গাছের নীচে মাটীর নি¤েœ অনেক বৌদ্ধ মূর্ত্তি আছে।” গুরুদেবের এসব কথা শুনে কামিনী কুমার দত্ত মজুমদার উল্লেখিত বটবৃক্ষের অনুসন্ধান করিতে জঙ্গলে প্রবেশ করিলেন। এই জঙ্গলের এক পাশের্^ বহু বাঁশ ছিল। অন্যান্য স্থানে ছোট বড় নানা প্রকার গাছে পরিপূর্ণ ছিল। হঠাৎ জঙ্গলের মধ্যে দেখিতে পাইলেন ১০/১২ হাত লম্বা একটী বট বৃক্ষ। ঐ বটগাছের কান্ডের ভিতরের দিক খোলা। গাছটি দেখিয়াই মনে হইল নিশ্চয় এই বৃক্ষ অন্য গাছ আশ্রয় করিয়া জন্মিয়াছিল। কালক্রমে আশ্রয়কৃত গাছটি মরিয়া যায়। বট বৃক্ষটির শিকর মাটিতে প্রবেশ করে। এ বিষয়টি নিয়ে বহু চিন্তা করিতে থাকেন। এমন সময় গ্রামের একজন প্রৌঢ় রাখাল ঐ জঙ্গলের এক পাশের্^ বসিয়া ছিল দেখিতে পেলেন। তিনি রাখালকে এই বটগাছের কান্ডের ভিতরটা খোলা কেন জিজ্ঞাসা করিলেন? তদুত্তরে ঐ রাখাল বলিল, এই বটগাছটি একটি খেজুর গাছ আশ্রয় করিয়া জন্মিয়াছিল। কালক্রমে খেজুর গাছটি মরিয়া যাওয়ায় গাছের ভিতরটি খোলা হইয়া যায় এবং বটগাছটি মাটির আশ্রয় করিয়া দাড়াইয়া থাকে। শ্রীশ্রী গুরুদেব এই গাছ সম্পর্কে যাহা বলিয়াছিলেন ঐ রাখাল তাহাই বলিল। ফলে কামিনী বাবুর মনে গুরুদেবের অপার মহিমার কথা কীর্ত্তন করিতে লাগিল। বৌদ্ধ মূর্ত্তি ঐ বটগাছের অনেক নিচে মাটি খুড়িয়া বাহির করিতে হইবে ভাবিয়া তিনি আর বৌদ্ধ মূর্ত্তিগুলি পাইতে চেষ্টা করিলেন না। শ্রী কামিনী কুমার মজুমদারের পিতার নাম স্বর্গীয় কৃষ্ণ কুমার দত্ত মজুমদার। হর কুমার দত্ত ও পূর্ণ চন্দ্র দত্ত নামে উনার দুই খুড়া ছিলেন। পূর্ণ চন্দ্র যুব শক্তিশালী পুরুষ ছিলেন। ভারিকোটা দত্ত বাড়ীতে তিনি বিবাহ করিয়া ছিলেন। তাঁহার একটি কন্যা সন্তান ছিল। বিবাহের পূর্ব্বেই তাঁহার মৃত্যু হয়। কালী কুমার, চন্দ্র কুমার ও রাম কুমার নামে তাহার পিতার জেঠতুত ভাই ছিল। তাহারা তাঁর জন্মের অনেক পূর্বেই পরলোকে চলিয়া যান। কামিনী বাবুর বয়স যখন ৪ বৎসর তখন তাঁহার পিতৃদেব পরলোক গমন করেন। তিনি উচ্চ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার বংশ গৌরবের কথা শুনিলে অবাক হইতে হয়। তাঁহার পূর্ব পুরুষদের জমিদারী ছিল। বিহার মন্ডল গ্রামে তাদের বংশাবলীর দুইটি বিরাট বাড়ি ছিল। প্রত্যেক বাড়িতে অনেক লোক ছিলেন। বাড়িতে পাচক, ব্রাহ্মণ পাক করিত। পাক শেষ হইলে ঘন্টা ধ্বনি হইত। ঘন্টা ধ্বনি শুনিলেই বাড়ির সকলেই আহার করিতে আসিতেন। বাড়িতে অনেক কর্ম্মচারী থাকিতেন। চাকর চাকরাণীও বহু ছিল। পাইক পেওদাও কম ছিলনা। বাড়ীতে ল²ী নারায়ণ বিগ্রহ স্থাপিত ছিল। নিত্য পূজা হইত। পূজক ব্রাহ্মণ ছিল। এই বিগ্রহের নামে বহু নিষ্কর সম্পত্তি ছিল। এই সম্পত্তির আয়ের দ্বারাই বিগ্রহের পূজার খরচ চলিত। বাড়িতে ১২ মাসে ১৩ পার্বণ অহঃরই হইত। বাড়িতে অতিথিশালাও ছিল। প্রায় ১৩ খন্ড বিভিন্ন নামের তালুক ছিল। কামিনী বাবুর জন্মের পূর্বেই এই সকল তালুক হস্তচ্যুত হয়ে যায়। প্রজাদের বিচার আচার তাহাদের বাড়িতেই হইত। বাড়িতে বিচারালয় ছিল। বাড়ির পাশেই জেল খানা ছিল। দোষী ব্যক্তিদের এই জেলখানাতে আটক রাখা হইত। ইহা বহু পূর্বের কথা। তাদের উদ্ধতন পঞ্চম পুরুষ স্বর্গীয় রূদ্র নারায়ণ দত্ত মজুমদারের আমলেই তাদের বংশের গৌরব বৃদ্ধি পায়। তিনি খুব প্রতাপশালী স্বনাম ধন্য পুরুষ ছিলেন। শিক্ষা, সভ্যতা, ধর্ম্মাদি কার্য্য পরোপকারিতার জন্য দত্ত বংশ প্রসিদ্ধি লাভ করে। তখনকার দিনে অনেকেরই জলাশয়ের খুব অভাব ছিল। দত্ত বংশীয়েরা বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৬টি দীঘী ও পুষ্করিনী খনন করিয়া জনসাধারনের পানীয় জলের অভাব দূর করিয়াছিলেন। প্রায় ১৫০ বৎসর পূর্বে শ্রী কামিনী কুমার দত্ত মজুমদারের পিতামহ স্বর্গীয় রামগতি দত্ত ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের অধীনে দেওয়ানী চাকুরী করিতেন। সে সময় দেশীয় লোকের পক্ষে ইহাই সর্ব্বোচ্চ সম্মানজনক বড় চাকুরী ছিল। এতে মান-সম্ভ্রম এবং অর্থোপার্জ্জন যথেষ্ট হইত। তাহার সময়ে বংশের মর্য্যাদা ও গৌরব আরম্ভ বৃদ্ধি পায়। জন হিতকর কার্য্যরে জন্য উনার পূর্ব্ব পুরুষগণের খুব সুনাম ছিল। কেহ কোন জিনিসের প্রার্থী হইলে কখনও বিমুখ হইতনা। দত্তবংশের বংশ পরম্পরা গুরুর বাড়ি ছিল চাঁদপুর মহকুমার অন্তর্গত বোয়ালিয়া গ্রামে। এই গ্রাম চাঁদপুর মহরের উত্তর দিকে। পৈত্রিক গুরুকে অনেক নিষ্কর ব্রহ্মোত্তর সম্পত্তি দান করেছিল। পৈত্রিক গুরু বংশীয়েরা খুব নিষ্ঠাবান, সরল, উদার এবং ভক্তি সম্পন্ন ব্রাহ্মণ ছিলেন। তারা প্রতি বৎসর অন্ততঃ দুই বার শিষ্যের বাড়িতে যেত সেই নিষ্কর রাজ সম্পত্তির খাজনা আদায় করিতে। কিন্তু কামিনী কুমার দত্ত মজুমদার সেই পৈত্রিক গুরু বংশীয়দের কাহারো নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেন নাই। গুরুকরণ সম্পর্কে শ্রী কামিনী বাবুর নিজের কথা প্রদত্ত হইলÑ “আমি প্রায় ৫০ বৎসর পূর্ব্বে আমার শ্রীগুরুর নিকটে সর্ব্বধর্ম্মমতে দীক্ষা গ্রহণ করি। কৃষ্ণ কুমার সাধু নামে সর্ব্বধর্ম্মের একজন গুরুর কৃপা প্রাপ্ত সাধক আমাদের গ্রামে বাস করিতেন। তিনি আমাকে খুব ¯েœহ করিতেন। সময় সময় তিনি আমাদের বাড়ি আসিতেন। তাহার নিকটেই আমি শ্রীগুরুর অনেক কাহিনী শুনিতে পাই। ক্রমেই সর্ব্বধর্ম্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। অবশেষে ১৯১৮ইং সনে সর্ব্ব প্রথম শ্রীগুরুর চরণ দর্শন করিতে কৃষ্ণনগর চলিয়া যাই। তাঁহার সৌম্য মূর্ত্তি, প্রিয় দর্শন এবং মধুর বাক্য শুনিয়া আমি তাঁহার নিকট দয়াময় নাম গ্রহণ করি। তখন আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী ছিলাম। পরীক্ষার জন্যও নাম গ্রহণ করিয়াছিলাম। আমার ধর্ম্ম প্রাণতা তখন ছিলনা। তবু শ্রীগুরু আমাকে নিজ গুনে দয়া করিয়া নাম দিয়াছিলেন। তিনি অহেতুক কৃপা সিন্ধু ছিলেন।” মিশনাবতার শ্রীমৎ লব চন্দ্র পাল গুরুমহারাজই তাঁহার সেই পরম আরাধ্য গুরু যার শ্রীচরণ আশ্রয় করিয়া তিনি জীবনকে ধন্য করিয়াছিলেন। শ্রী কামিনী কুমার দত্ত মজুমদার পিতা মাতার কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন। তাঁহার পিতা খুব ধর্মপ্রাণ ছিলেন এবং মাতা খুব সরল প্রকৃতির ছিলেন। মিথ্যা, প্রবঞ্চনা, হিংসা তাঁহার নিকট স্থান পাইত না। তাঁহার জন্ম হওয়ার কিছুকাল পূর্ব থেকেই দত্ত বাড়ির ঐতিহ্য অনেকটা বিলুপ্ত হয়ে গিয়াছিল। ধন সম্পত্তি ক্রমেই বিনষ্ট হইতে থাকে। বংশ লয় পাওয়ার সময় হইলে যাহা হয় তাহাই হইতেছিল। বংশের বহু লোক মৃত্যুগ্রাসে পতিত হয়। তাঁহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার অকাল মৃত্যুতে তাঁহার পিতা শোকে বিহŸল হইয়া পড়ে। বার্দ্ধক্য হেতু তিনিও অচল হইয়া পড়িয়াছিলেন। তাঁহার পিতাই তখন শেষ বংশজ ব্যক্তি। তখন কামিনী বাবুর বয়স ৪ বৎসর মাত্র। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার মৃত্যুর পর পিতা তাঁহার ভরসাও ছাড়িয়া দিলেন। বংশের জনবল সমূলে ধ্বংস হওয়ায় বিত্ত, অর্থ, প্রভাব প্রতিপত্তি সবই প্রায় বিলীন হইয়া গেল। ১৩১০ বাংলা সনের ১১ই বৈশাখ শুক্রবার কৃষ্ণা দ্বাদশীতে কামিনী বাবুর যখন ৪ বছর বয়স তখন উনার পিতার মহাপ্রয়ান হয়। সংসারে তাঁহার একমাত্র গর্ভধারিনী মা-ই জীবনের শেষ অবলম্বন রহিল। ঈশ^র তাঁহাকে বংশের শেষ সন্তানরূপে সৃষ্টি করিলেন। তাঁহার মা সব সময় ভাবিতেন কোন সময় বংশের শেষ প্রদীপ নিভিয়া যায়। এদিকে কামিনী বাবুর শ্রীগুরু শ্রীমৎ লব চন্দ্র পাল তাঁকে বিশেষ কৃপা করিবার জন্য অলক্ষ্যে কৃষ্ণ কুমার সাধুর মাধ্যমে তাঁহার নিকট নিয়ে যান। এ বিষয়ে কামিনী বাবুর নিজের শ্রীমুখের কথা প্রদত্ত হইল । “ যখন আমি ৯ম শ্রেণীতে পড়ি তখনই আমি দয়াময় নামের আশ্রয় গ্রহন করি। মধ্যনগর নিবাসী কৃষ্ণ কুমার সাধু নামে জনৈক দয়াময় ভক্ত আমাদের গ্রামে থাকিয়া দয়াময় নাম প্রচার করিতেন। তিনি গুরুর কৃপা প্রাপ্ত ব্যক্তি ছিলেন। সকলেই সাধু বলিয়া তাহাকে মান্য করিত। আমি তাহার নিকট সর্ব্বধর্ম্মের অনেক কাহিনী জানিতে পারি। শ্রীগুরুর মহিমাও অনেক সময় তিনি আমাদের নিকট কীর্ত্তন করিতেন। এতেই আমার মন ক্রমে ক্রমে শ্রীগুরুর প্রতি আকৃষ্ট হয়। আমি যখন ১৯১৮ সনে ফতেপুর স্কুলে ১০ শ্রেণীতে পড়ি তখন একদিন আমি শ্রীগুরু দর্শন করিতে কৃষ্ণনগর গিয়াছিলাম। শ্রীগুরু আমাকে বলিলেন, “তুমি কি চাও?” তদুত্তরে আমি বলিলাম “আমি সংসারের উন্নতি চাই। অন্তর তখন বিত্ত অর্থ ব্যতীত ধর্ম্ম চাইত না। সুতরাং অন্তরের সত্য চাপিয়া মিথ্যা বলিতে পারি নাই। তখন শ্রীশ্রী কর্ত্তা মহারাজ বলিলেন, “সংসারের পর ঈশ^র চাও কিনা?” তদুত্তরে হা বলিলাম কিন্তু অন্তরের সহিত হা বলিতে পারি নাই। মৌখিক বলিয়াছিলাম সত্য। এজন্য মনে হয় আমি আজও ধর্ম্মের কোন সৌরভ পাইতেছি না যদিও তাঁহার কৃপায় ধর্ম্ম রাজ্যের কেন্দ্রে বসিয়া আছি। তাঁহার ¯েœহ দৃষ্টি ও মধুর বচন শ্রবণ করিয়া আমি মুগ্ধ হইয়াছিলাম। তখন আমি তাঁহার নিকট নাম প্রার্থনা করি। তিনি আমাকে নাম দিলেন। এই নাম পাইয়া মহা আনন্দে আমি ফতেপুর স্কুলে চলিয়া আসি। ইহাই আমার প্রথম গুরুদর্শন। ম্যাট্রিক পাশ করিয়া কলেজে ভর্ত্তি হইবার জন্য শ্রীগুরুর আদেশ প্রার্থনা করি। তিনি আমাকে কলেজে ভর্ত্তি হইতে নিষেধ করিলেন। কলেজে পড়িবার প্রবল আকাঙ্খা তাঁহাকে জানাইলাম। তিনি বলিলেন দয়াময়ের ইচ্ছা নাই তুমি আর লেখা পড়া কর। যদি কলেজে ভর্ত্তি হও তবে ভীষণ অনিষ্ট হইবে। তিনি বলিলেন দয়াময়ের আদেশ অমান্য করিয়া আরও দুই জন ছাত্র পড়িতে আরম্ভ করিলেÑ একজন পাগল হইয়া যায় আর একজনের মৃত্যু হয়। তাঁহার শ্রীমুখে এমন নিষেধাজ্ঞা শুনিতে পাইয়া কলেজে পড়িবার বাসনা সম্যক রূপে পরিত্যাগ করি।” “একদিন তিনি আমাকে বলিলেন, “তোমাদের বাড়ীতে দোষ আছে। তোমাদের পূর্ব্ব পুরুষদের অনেক অমুক্ত আত্মা বাড়ীতে আসিয়া ক্ষতি করিতেছে। এসব দোষ দূর হইবার জন্য অনেক নামজপ করিতে দিলেন। রাত্রিতে সময় সময় বাড়ীতে খুব ভয় হইত। কোন সময়ে রাত্রে বিকট শব্দ শুনিতে পাইতাম। গভীর রাত্রে সজোরে অনেক রাশ ভাদুরা যাইত ঐরূপ শব্দ শুনিতাম। এতে বাড়ীর সকলের মনে ভয়ের সঞ্চার হইত। আমরা বাড়ীর পশ্চিম দিকে রাত্রিতে একা যাইতে সাহস পাইতাম না। এসব বিপদ আপদ, ভয় ভীতি দূরীকরণার্থে শ্রীশ্রী কর্ত্তা মহারাজ আমাকে এক যজ্ঞের ব্যবস্থা করে দিলেন। প্রতি অমাবস্যা রাত্রে (গভীর রাত্রে) বাহির বাটীতে আদেশ মত এক বৎসর এই যজ্ঞানুষ্ঠান হইত। ভয়ের কারণে যজ্ঞের সময় ২জন লোক নিকটে থাকিত। ১২ মাস এরূপ যজ্ঞ করার পর আমাদের বাড়ী দোষ শূন্য হইল। কাহারো মনে কোন ভয়ের সঞ্চার হইত না। আমরা নির্ভয়ে চলিতাম। আমাদের বংশ রক্ষার জন্য শ্রীশ্রী কর্ত্তামহারাজ নিজে অনেক কাজ করিয়াছেন, আমাকেও অনেক নামজপ করিতে দিয়াছিলেন। আমার প্রথম তিনটি সন্তান অকালে মৃত্যুমুখে পতিত হয়। ইহা জানিয়া তিনি বংশ রক্ষার জন্য আধ্যাত্মিক ভাবে অনেক কাজ করিয়াছিল। তাঁহারই আশীর্ব্বাদেই বর্তমানে ৩টি পুত্র সন্তান এবং ৪টি কন্যা সন্তান বাঁচিয়া আছে। দয়াময় স্বয়ং শ্রীগুরু রূপে আবির্ভূত হইয়া আমার বংশ রক্ষার উপায় করিয়াছিল। তাঁহার কৃপা দৃষ্টি না থাকিলে এতদিনে আমাদের বংশ বিলোপ হইয়া যাইত। ইহাও শ্রীগুরুর কৃপার এক বিশেষ নিদর্শন।” “১৩৩০ সনের ২৯শে ফাল্গুন কাকমার নিবাসী স্বর্গীয় অধর চন্দ্র ব্রহ্ম মহাশয়ের তৃতীয় কন্যা শ্রীমতি হেমনালনীর সহিত আমার শুভ পরিণয় কার্য্য সম্পন্ন হয়। শ্রীগুরুর আদেশেই এই পরিণয় কার্য্য সম্পন্ন হয়। বিবাহকালে আমার বয়স ২৫ বৎসর এবং হেমনালনীর বয়স ১১ বৎসর ছিল। শ্রীগুরুর আশীর্ব্বাদে তাহাকে লইয়াই জীবন পথে এ পর্য্যন্ত শান্তিতে চলিয়া আসিয়াছি। ভবিষ্যতে কি হইবে দয়াময় জানেন। শ্রীশ্রী কর্ত্তা মহারাজ হেমনালনীকে খুব ¯েœহ করিতেন। সে নিজে আহারীয় প্রস্তুত করিয়া শ্রী গুরুকে সেবা করাইলে তিনি খুব সন্তুষ্ট হইতেন। বরকান্তা আশ্রমের বার্ষিক উৎসব কালে একবার শ্রীশ্রী গুরুদেব বহু মহিলা উপস্থিত থাকা সত্তে¡ও বলিলেন কামিনীর স্ত্রী না আসিলে উৎসবে দয়াময়ের ভোগের পাক কেহ করিতে পারিবেনা। অবশেষে উৎসবের পূর্ব্ব রাত্রিতে লোক পাঠাইয়া তাহাকে উৎসবের দিন প্রাতঃকালে বাড়ী হইতে আনয়ন করেন। ভোগ রাগের কাজ আমার স্ত্রীকেই করিতে আদেশ দিলেন। ইহা তাঁহার করুণার নিদর্শন। হে পরম মঙ্গল দয়াময় তুমিই শ্রীগুরুরূপে আবির্ভূত হইয়া জগতের অশেষ কল্যাণ সাধন করিতেছ।” “ম্যাট্রিক পাশ করিয়া আমি ১৯২১ইং সনে ফুলতলী মধ্য ইংরেজী বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার কাজ আরম্ভ করি। ৩৭ বৎসর এই স্কুলে কাজ করিবার পর শ্রীগুরুর আদেশে স্কুলের কাজ ছাড়িয়া দিয়াছি। বাড়ীতে থাকিয়া স্কুলে কাজ করিতাম। সঙ্গে সঙ্গে সংসারের যাবতীয় কাজ কর্ম্ম দেখিতাম। ১৩৪৪ বাং সনে বরকান্তা আনন্দ আশ্রমের প্রতিষ্ঠা হইলে ২০ বৎসর সম্পাদক রূপে ঐ আশ্রমের কিছু সেবা কার্য্য করিয়াছি। শ্রীগুরুর আদেশেই এই আশ্রমের সেবা করিবার সুযোগ পাইয়া ছিলাম। শশী চৌধুরী, হর কুমার কর, রমনী মজুমদার ও অন্যান্য আরও কয়েক জন সহকর্মীর সাহায্যে এই আশ্রমের যাবতীয় কার্য্য করিতাম। ১৩৬৩ বাং সনের জ্যৈষ্ঠ মাসে গ্রীষ্মের ছুটিতে আমি রমনী মজুমদার সহ শ্রীগুরুর চরণ দর্শন মানসে অরুন্ধুতীনগর গিয়াছিলাম। তখন শ্রীশ্রী কর্ত্তামহারাজ বলিলেন, “আমি এদেশে চলিয়া আসিয়াছি। পাকিস্থানের মিশনের কাজ ঠিকভাবে চলিতেছেনা। মিশনের কার্য্যভার গ্রহন করিবার জন্য আমি পূর্ব্বে তোমাকে বলিয়াছি তুমি কিছুই কর নাই। সুতরাং সেখানকার মিশনের কাজের ভার গ্রহন করিতে আজ স্বীকার কর অথবা কাজ করিতে না পারিলে অস্বীকার করিতে পার। তোমাকে এই কাজ করিতে আর কখনও বলিব না।” তাঁহার এই কথা শ্রবন করিয়া অত্যন্ত চিন্তিত হইয়া পরিলাম। অবশেষে ভাবিলাম গুরুর আদেশে জগতের বহুলোক কত স্বার্থ ছাড়িয়া দিয়া আদেশমত কার্য্য করিয়াছেন। তখন মনে মনে স্থির করিলাম এবং বলিলাম আপনার যাহা আদেশ তাহা শিরধার্য্য করিয়া লইব। শ্রীগুরুর আদেশ মত বাড়ী, ঘর, সম্পত্তি যাহা ছিল তাহা সব বিক্রয় করিয়া ১৩৬৩ বাং সনের ২৭ শে ফাল্গুন বাড়ী ঘর ছাড়িয়া সকলকে লইয়া বরকান্তা আশ্রমে চলিয়া আসি এবং ১৩৬৪ বাং সনের ১৫ই ভাদ্র ভোলাচং আসিয়া ২১ শে ভাদ্র শ্রীগুরুর আদেশ মত মিশনের সেবার ভার গ্রহণ করি। শ্রীগুরুর আশীর্ব্বাদে কয়েক বৎসর মিশন সেবা করিবার পর দুর্ভাগ্য বশতঃ ১৩৭৩ বাংলা সনের ১৭ই জ্যৈষ্ঠ মঙ্গলবার রাত্রি ১টা ৪৫ মিনিটের সময় পরমারাধ্য গুরুদেব আমাদিগকে ছাড়িয়া অমর ধামে চলিয়া যান। তাঁহার অন্তর্ধানে সহ¯্র সহ¯্র তাঁহার সন্তানগণ শোকে মর্ম্মাহত হন। আমরা কিংকর্ত্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়ি। তৎপর সময় সময় তাঁহার কোন কোন সন্তানকে স্বপ্নযোগে দর্শন দিয়া বলিয়াছেন, “আমি মরি নাই। দেখ আমি পূর্ব্ববৎ আছি। জগতের কার্য্য করিবার জন্যই চলিয়া আসিয়াছি। তোমরা ঠিকভাবে মিশন সেবা কর। কোন ভয় নাই।” শ্রী কামিনী কুমার দত্ত মজুমদার ছিলেন সর্ব্ব ধর্ম্ম মিশনের একজন উৎসর্গীকৃত প্রাণ। যার হৃদয়ে কেবল মিশনের আদর্শই প্রস্ফূটিত হয়েছিল। তিনি শ্রীগুরুর আদর্শকে জগতে পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য জীবন উৎসর্গ করিয়াছেন। তিনি সর্ব্ব ধর্ম্ম মিশনের আদর্শ জগতে প্রচারিত হওয়ার জন্য শ্রীগুরু প্রবর্তিত গ্রন্থাবলীর উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও বিশুদ্ধ প্রচারের ব্যবস্থা করিয়াছেন এবং গুরুর আদেশে মিশন ভক্তদের উপকারার্থে তিনি নিজেও কিছু সংখ্যক বই লিপিবদ্ধ করেন। শ্রী কামিনী কুমার দত্ত মজুমদার কর্তৃক সংগৃহীত কিছু সংখ্যক বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ‘সারসংগ্রহ’, সর্ব্বধর্ম্ম আরতি ও বিধি, শ্রীগুরুর বাণী, সর্ব্বধর্ম্ম মিশন ও সর্ব্বধর্ম্মের সারতত্ত¡, শ্রীশ্রী কর্ত্তামহারাজ। এসকল বইগুলোর মূল উপজীব্য বিষয় শ্রীমৎ আনন্দ মহারাজ ও শ্রীমৎ লব চন্দ্র পাল গুরুমহারাজের বিভিন্ন উপাসনা ও বাণী। সর্ব্বধর্ম্মার্থীগণের সর্ব্বধর্ম্ম ও সর্ব্ব ধর্ম্ম মিশনকে সহজে বুঝার জন্য তিনি এসকল বই লিপিবদ্ধ করেন। তিনি আজীবন সর্ব্ব ধর্ম্ম মিশনের কার্য্য করিয়া জীবন উৎসর্গ করে সর্ব্বধর্ম্ম মতে প্রথম শ্রেণীর সভ্য হইয়াছেন। তাঁহার জীবন ও কর্ম মিশন প্রজন্মের ভক্তদের নিকট চিরদিন আদর্শস্থানীয় হয়ে থাকবে। শ্রী কামিনী কুমার দত্ত মজুমদার ১৪০৩ বাংলা সনের মাঘ মাসে পরলোক গমন করেন। (সংগৃহীত : শ্রী কামিনী কুমার দত্ত মজুমদারের নিজ হস্তে লিখা পাÐুলিপি থেকে। উনি এটি লিখেছিলেন বাংলা ১৩৭৬ ও ইংরেজি ১৯৬০ সালে।)