Notice Hotline:01787612121Visitor Count: 21731

শ্রীমৎ মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দীর জীবনী:

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত কালীকচ্ছ গ্রামে মহাপুরুষ শ্রীমৎ মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দী ১২৬১ বাংলা সনের ৮ই অগ্রহায়ণ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতার নাম শ্রী শ্রী মদাচার্য্য আনন্দ চন্দ্র নন্দী। মহামন্ত্র দয়াময় নাম প্রচার করিয়াই শ্রী শ্রী আনন্দ মহারাজ অবতার হইয়া জগতবাসীর মুক্তির পথ প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন। শ্রী আনন্দের পিতার নাম শ্রী শ্রীমৎ রামদুলাল নন্দী। তিনি শিক্ষায় প্রবীণ ছিলেন। তিনি জগত মাতা কালীর উপাসক ছিলেন। বংশ পরম্পরায় একাধিক্রমে এমন তিনজন মহাপুরুষ কোন বংশে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন এরূপ দৃষ্টান্ত জগতে বিরল। কালীকচ্ছের নন্দী বংশের কথা এতদ্দেশে অনেকেই জানে। রাজীন্দ্র নারায়ণ নন্দীই কালীকচ্ছ নন্দী বংশের বিখ্যাত লোক ছিলেন। তাহার সন্তান সন্ততি হইতেই নন্দী বংশ বিস্তৃতি লাভ করে এবং ভক্তি-ভাজন মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দীও সেই নন্দী বংশের উত্তরসূরী। শ্রী শ্রীমদাচার্য্য আনন্দ চন্দ্র নন্দী মহারাজের একমাত্র পুত্র মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দী। বিদ্যাবত্তা, ধর্ম্মবল, বিনয়, শিষ্টাচার, পরোপকারিতা ইত্যাদি সদগুণ নন্দী বংশের গৌরব চারি দিকেই সমুজ্জ্বল করিয়া রাখিয়াছে। ১২৬৯ বাংলা সনে নবম বর্ষ বয়সে শ্রীমৎ মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দী কুমিল্লা জিলা স্কুলে ভর্তি হয়ে অধ্যয়ন করিতে থাকেন। তাহার খুল্লতাত কৈলাস চন্দ্র নন্দী মহাশয়ও কুমিল্লা জিলা স্কুল হইতে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় বৃত্তি লাভ করেন। তৎপর ভক্তি ভাজন মহেন্দ্র বাবুও ৩ বৎসর কুমিল্লা জিলা স্কুলে অধ্যয়ন করিয়া তাহার খুল্লতাতের সঙ্গে ১২৭২ বাংলা সনে ঢাকায় আসিয়া স্কুলে ভর্তি হয়ে পাঠ করিতে থাকেন। এ সময় তাহাদের উভয়ের লেখাপড়ার খরচের জন্য ঢাকা শহরে শ্রী শ্রীমদাচার্য্য আনন্দ চন্দ্র নন্দী মহারাজ ঢাকার ইসলামপুরে একটি ঔষধের দোকান খুলিয়া ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে কারবারটি লাভ জনক হয় নাই। এ সময় আনন্দ স্বামীজী মহারাজ তাদের লেখাপড়ার জন্য অধিকাংশ সময় ঢাকা শহরেই বাস করিতেন। ১২৭৭ বাংলা সনে শ্রীমৎ মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দী এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাস করেন। তৎপর ঢাকা কলেজে আই.এ পাস করিয়া পরে বিজ্ঞান পাঠ করিতে মনস্থ করিলেন। তৎপর তিনি কলিকাতা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে মনোযোগ সহকারে পাঠ করিতে থাকেন। তখন হইতেই তিনি জড় শক্তির ধ্যান এবং কি উপায়ে জড় শক্তি মানুষের কাজে খাটান যায় সেই চিন্তায় অবিরাম ব্যস্ত থাকিতেন ধর্ম্ম সাধনার দিকে তখন তিনি তেমন লক্ষ্য করেন নাই। এভাবে ৪ বৎসর কলিকাতা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়ন করেন। কলিকাতা অবস্থিতির শেষ বৎসর তাহার পিতা শ্রীমৎ আনন্দ স্বামীজী মহারাজ সপরিবারে কলিকাতায় আসিয়া কিছুকাল ব্রাহ্মধর্ম্ম প্রচার করেন। তখন শ্রীমৎ মহেন্দ্র বাবু জড় ধ্যানে মগ্ন থাকিয়াই তাহার পিতার ব্রাহ্মধর্ম্ম প্রচার কার্য্য দূর হইতে কিছু লক্ষ্য রাখিতেন। তখন শ্রীমৎ মহেন্দ্র বাবু পিতার ভাব কিছুই হৃদয়ঙ্গম করিতে পারেন নাই বরং দূর হইতে তিনি তাহার পিতার সাধন প্রণালী অসংশ্লিষ্ট দর্শক রূপে চিন্তা করিতেন। ১২৮৬ বাংলা সনের ২৬শে কার্ত্তিক শ্রীল মহেন্দ্র বাবুর শুভ বিবাহ কার্য্য সুসম্পন্ন হয়। বিক্রমপুর তাঁহার শ্বশুর বাড়ী ছিল। তাঁহার স্ত্রীর নাম সৌদামিনী দেবী। স্বামীজী মহারাজ ব্রাহ্মধর্ম্ম মতেই তাহার পুত্রের বিবাহ কার্য্য সম্পন্ন করেন। এই শুভ অনুষ্ঠানকালে স্বামীজী মহারাজ যে সঙ্গীত রচনা করেছিলেন তাহা নিম্নে প্রদত্ত হইল-

রাগিনী সরফরদার- তাল ঝাঁপ। আজি আনন্দে কর, বিভু গুনগান, যাঁহার প্রসাদে এই শুভ অনুষ্ঠান। প্রেমের মুরতি হয়ে, ঘরে ঘরে বিচরিয়ে, করিছেন সকলেরে সহজ প্রেম দান। উভয়ে মিলন হইল, চকোরী চাঁদে বরিল, মধ্যে সুধা বরষিল মঙ্গল নিধান।

কালক্রমে শ্রীল মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দীর ৮জন পুত্র সন্তান ও দুই কন্যার জন্ম হয়। পুত্রদের নাম:- বীরেন্দ্র, বিবেকচন্দ্র, পুলক, উপাসক, অশোক, সেবক, সাধন ও মিলন। পূর্ণমাসী ও অমিয়াহাসী নামে তাহার দুই কন্যা ছিল। পরবর্ত্তীকালে তাহারা জন্মভূমি ছাড়িয়া ভারতে চলিয়া যান। তাহাদেও বংশধর অনেকেই বর্তমানে শিক্ষা-দীক্ষা লাভ করিয়া সসম্মানে জীবন পথে অগ্রসর হইতেছে। ভারতের বিভিন্ন স্থানে এখন তাহারা আবাস ভূমি প্রস্তুত করিয়া সংসার ধর্ম্ম লইয়া জীবন যাপন করিতেছেন।

১২৯৪ সন হইতে ১৩০৬ সন পর্যন্ত ১৩ বৎসর কাল তিনি পিতার নিকট থাকিয়া যেমন কঠোর সাধন করিয়া ধর্ম্মের উচ্চতম সোপানে আরোহন করিয়াছিলেন। তেমনি চিকিৎসক হিসাবেও খুব খ্যাতি লাভ করেন। রোজই বহু ব্যাধিগ্রস্ত লোক রোগ মুক্তির জন্য তাহার নিকট আসিত। তিনি সমভাবে গ্রহণ করিতেন। গরীব, দুঃখীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা করিতেন। তাঁহার আপন পর প্রভেদ ছিল না। জল ভাতের মত অর্থ আসিত এবং জগৎবাসীর মঙ্গলার্থে খরচও হইত। সেবার ভাব মনে রাখিয়াই তিনি সব কাজ করিতেন। কলিকাতায় অবস্থান কালে তিনি কাপড়ের কল স্থাপন করিয়া খ্যাতি লাভ করেন। ছাপার কালি প্রস্তুতের এক কারখানা খুলিয়াও খুব খ্যাতি লাভ করেন। কালীকচ্ছ বাড়ীতেও তিনি দিয়াশলাইয়ের কল স্থাপন করিয়া খুব সুখ্যাতি লাভ করেন। ভারতবর্ষে দিয়াশলাইয়ের প্রচলন প্রথম তিনিই করেন। তাঁহার পূর্বে দিয়াশলাইয়ের কারখানা কোথাও ছিলনা। ঝিনুকের বোতামের কারখানা ও নারিকেলের মালা হইতে বোতাম প্রস্তুতের কারখানাও তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। বহু লোক লইয়াই তিনি এসব কল কারখানা খুলিয়া বহু লোকের উপকার করিয়া গিয়াছেন। জড় বিজ্ঞানের উন্নতি তাহার ভিতর দিয়া এ দেশে বিস্তার লাভ করিয়াছিল। আর এসকল মেধাশক্তির অন্তরালে তাঁহার পিতা শ্রীমৎ আনন্দ মহারাজই অলক্ষ্যে কার্য্য করিয়াছেন। স্বামীজী মহারাজ তৎপুত্র শ্রীমৎ মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দী ও পুত্র বধুর সাধন সম্পর্কে এক উপাসনায় যাহা লিখিত আছে তাহা নিম্নে প্রদত্ত হইল : “মহেন্দ্র ও বধূর মধ্যে সিদ্ধি বিদ্যা আজ হইতে বিশেষ ভাবে উপস্থিত হইল।...” সর্ব্ব ধর্ম্ম সাধন তত্ত্ব ও প্রণালী।

তিনি প্রথমে পিতার প্রতি ধর্ম্ম সম্বন্ধে আস্থাবান ছিলেন না, কিন্তু পুত্র হিসাবে তাঁহার প্রতি তাঁহার অচলা ভক্তি ছিল। পিতার তিরোধান হইলেই তাঁহার অন্তরে ধর্ম্ম পিপাসা এবং অসীম শক্তির প্রেরণা জাগিয়া উঠে। তাঁহাকে তাহার পিতৃদেব সময় সময় দেখা দিতেন এবং তাঁহার প্রতি উপদেশ করিতেন। ইহাতেই তিনি পরলোকে বিশ্বাসী হয়ে, ‘দয়াময়’ নাম সাধনে জীবন ঢালিয়া দেন এবং পরিশেষে সকল ছাড়িয়া পিতার চরণে আত্মসমর্পণ করেন। তাঁহার সাধনার বিষয় কার্য্যপ্রণালী যাহারা জানেন কেবল তাহারাই তাঁহার অলৌকিক আচার ব্যবহার ও লীলা খেলা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করিতে পারিবেন। তিনি মহাপুরুষ ছিলেন। সংসারে তাঁহার তুল্য মানুষ মিলেনা এবং যে দেশে এমন ব্যক্তির জন্ম হয় সে দেশ তাঁহার আদর্শ লইয়া কার্য্য করিলে স্বর্গে পরিণত হইতে পারে। এই জন্যই তাঁহাকে ভারতের টলস্টয় বলা হইত।

শ্রীমৎ লব চন্দ্র পাল দয়াময়ের আদেশক্রমে সর্ব্ব ধর্ম্ম মিশন প্রতিষ্ঠার পর শ্রীমৎ মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দীর নিকট উনার পিতার ধর্ম্ম প্রচারার্থে শ্রীমৎ আনন্দ মহারাজের নির্দেশানুসারেই এই মিশন প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে সেই সত্য প্রকাশ করেন। তখন তিনি সিদ্ধি কোঠায় তদবিষয়ে ধ্যান করিয়া জানিতে পারিলেন যে- সর্ব্ব ধর্ম্ম মিশনই শ্রী আনন্দের ধর্ম্মমত জগতে প্রচার ও প্রতিষ্ঠার একমাত্র সংগঠন। তৎপর সর্ব্ব ধর্ম্ম যোগ মন্ডলী নামে তিনি যে ধর্ম্ম সংঘ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন তাহা বিলুপ্ত ঘোষণা করেন এবং তিনি সর্ব্ব ধর্ম্ম মিশনের প্রধান প্রচারক হিসাবে আজীবন মিশনের প্রচার করে দয়াময় নাম জগতে প্রতিষ্ঠার কার্য করিয়াছেন। পরম ভক্তি ভাজন মহেন্দ্র বাবু শ্রীশ্রী কর্ত্তামহারাজকে পাইয়া তাঁহাকে সহোদর ছোট ভাইয়ের মত দেখিতেন। সর্ব্ব ধর্ম্মের অনেক কথা তিনি শ্রীশ্রী কর্ত্তামহারাজকে জানাইয়াছিলেন। কিভাবে স্বামিজী মহারাজ কার্য্য করিতেন-সাধন ভজন করিতেন এবং কি প্রকারে তিনি দেহত্যাগ করিয়াছেন ইত্যাদি সকল ঘটনা তিনি উল্লেখ করিয়াছিলেন। শ্রীযুক্ত মহেন্দ্র বাবুর নিকট তিনি সর্ব্ব ধর্ম্মের বহু আধ্যাত্মিক জগতের কথা জানিতে পারিয়াছিলেন।

শ্রীমৎ মহেন্দ্র বাবু নিজে চেষ্টা করিয়া তাহার পিতা মাতার সমাধির উপর পাকা সুরম্য মন্দির নির্ম্মাণ করিয়াছেন। ইহার পশ্চাতে বাগান আছে, দক্ষিণে প্রকাণ্ড উঠান আছে, পশ্চিমে পুকুর, বান্ধান ঘাট আছে। সকল দিকেই খোলা স্থান আছে। মন্দিরের চারিদিকে পাকা বারান্দা আছে। উহাতে বসিয়া সকলে ভোজন করিতে পারে, শয়ন করিতে পারে ও ভক্তবৃন্দ সকলেই প্রাতে ও সন্ধ্যাায় মধুর আরতি কীর্ত্তন করিতে করিতে আনন্দে সমাধি পরিক্রমা করে। সমাধি মন্দিরের দক্ষিণ বারান্দার মধ্যস্থানে শ্রীশ্রী মার উনুন রহিয়াছে। জগজ্জননী এই চুল্লীতেই সারা দিন-রাত পাক করিতেন। স্বামী সেবা করিতেই তিনি জীবন ধারণ করিতেন। তিনি স্বামীর সঙ্গে উপবাস করিতেন- উপাসনা কালে স্বামীর পাশের্ আসনস্থা হইয়া ধ্যানে মগ্ন হইতেন। শ্রীল মহেন্দ্র বাবু ২/৪ বার তাঁহার পিতার অন্তর্ধানের পর তাহাকে দর্শন করিয়াছিলেন। ভক্তি ভাজন মহেন্দ্র চন্দ্র নন্দী সর্ব্ব ধর্ম্ম আরতির অর্থ বিবৃত করিয়া ধর্ম্মজগতে এক অমর কীর্তি রাখিয়া গিয়াছেন।

শ্রীল মহেন্দ্র বাবু ১৩৩৯ বাংলা সনের ২৫ আষাঢ় ভব লীলা সংবরণ করেন।

কালীকচ্ছ দয়াময় বাড়ীর বিভিন্ন নাম : ১। আনন্দপুরী ২। আনন্দ জয়দুর্গা ভবন ৩। মহা মহাকালীর লীলাভূমি ৪। প্রেমপুরী ৫। জগতের নাভিস্থল ৬। সর্ব্ব তীর্থের মিলনভূমি ৭। সর্ব্বধর্ম্মের আবাসভূমি ৮। জীবন মুক্তির কেলি নিকেতন ৯। সত্য সিন্ধু ১০। অমূল্য রতœাকর ১১। সাধন সমুদ্র ১২। প্রেম তীর্থ ১৩। আনন্দ কানন ১৪। দয়াময় নামের উদ্ধার ভূমি ১৫। সিদ্ধভূমি ১৬। শ্রী আনন্দধাম