সর্ব্বধর্ম্মাবতার শ্রীমৎ আচার্য্য আনন্দস্বামী জগতের সকল প্রকার ধর্মগত ও জাতিগত পাথর্ক্য নিরসন করে প্রকৃত প্রেমকে উদ্ধার করে বিশ্বজনীন সনাতন সত্য ধর্মকে সকল মানবজাতির কল্যাণে প্রতিষ্ঠাকল্পে বাংলা ১২৩৯ সনের ১১ই বৈশাখ রবিবার দিবসে বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সরাইল থানাধীন কালীকচ্ছ গ্রামে অবতীর্ণ হন। তিনি সুশিক্ষিত ও আদর্শ মানব ছিলেন। তাঁহার জন্মসময়ে জগন্মাতা মহাশক্তি স্বয়ং আসিয়া তাঁহাকে ক্রোড়ে লইয়াছিলেন। এ ঘটনা তাঁহার পিতা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন এবং মৃত্যুর কিছু সময় পূর্বে নিজ স্ত্রীর নিকট ব্যক্ত করিয়াছিলেন। তাঁহার পিতা দেওয়ান রামদুলাল নন্দী জগন্মাতা কালীর উপাসক ছিলেন এবং এতদঞ্চলে তাঁহাকে সকলেই সিদ্ধপুরুষ বলিয়াই মানিয়া থাকেন। তাঁহার রচিত ধর্ম সঙ্গীত এখনও প্রাচীন সঙ্গীত বিশারদ ব্যক্তিগণ গাহিয়া আনন্দ উপভোগ করেন।
মাতা আনন্দময়ীও খুব ধর্মপ্রাণা ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী দুইজনের এমন ধর্মের উন্নত অবস্থা লাভের ফলেই ‘দয়াময়’ স্বয়ং তাঁহাদের কাছে পুত্ররূপে আবির্ভূত হন। আনন্দ মহারাজ নন্দী বংশে জন্মগ্রহণ করেন। নন্দী বংশের ইতিহাস কালীকচ্ছ গ্রামে সুপ্রসিদ্ধ। কালীকচ্ছ, কুমিল্লা জেলার অতিশয় বিখ্যাত গ্রাম। রাজীন্দ্র নারায়ণ নন্দী কালীকচ্ছে নন্দী বংশে ঐ সময়ের বিখ্যাত পুরুষ। তাঁহার দুই পুত্র শিব প্রসাদ নন্দী ও গণপতি নন্দী। কালীকচ্ছের বর্তমান নন্দী বংশীয়েরা গণপতি নন্দীরই বংশধর। শ্যাম রাম নন্দী গণপতি নন্দীর বংশ উজ্জ্বল করিয়াছিলেন। তিনি একজন সাধু মহাত্মা ছিলেন। এই বংশেই শ্রী আনন্দ চন্দ্র নন্দী জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন।
শিক্ষা ও সংসার জীবন :-
শ্রীমৎ আনন্দস্বামীজীর শিক্ষা-দীক্ষা পিতার প্রযত্নে সকল প্রকারে প্রদত্ত হইয়াছিল। বাঙ্গলা, ইংরেজী, সংস্কৃত, হিন্দি, পার্শী ও উর্দ্দু প্রভৃতি ভাষায় অধিকার তাঁহার প্রভূত পরিমাণে জন্মিয়াছিল। পারিবারিক জীবনেও তাঁহার সুবিধা অনেক ছিল। তিনি উন্নত পরিবারের লোক ছিলেন। তাঁহার পিতার জমিদারী ছিল। ত্রিপুরা রাজস্টেটের রামদুলাল একজন ক্ষমতাশালী দেওয়ান ছিলেন। অল্প বয়সেই শ্রী আনন্দের শক্তিমন্ত্রে দীক্ষা হয়। বিবাহ নিয়াও মহা সমারোহ হইয়াছিল। বেজুড়া নিবাসী স্বর্গীয় কাশীনাথ চৌধুরী মহাশয়ের কন্যা শ্রীশ্রী জয়দুর্গা দেবীই তাঁহার পত্নী। পিতার পরলোক গমনান্তে প্রায় বিশ বৎসর বয়সেই তিনি সংসার পরিচালনার কার্য্যভার গ্রহণ করেন। সংসারের অভাব-অভিযোগ কিছুই ছিল না, কিন্তু নানা ঘটনা ক্রমে তিনি ঋণজালে জড়িত হইয়া পড়েন। ঋণ পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে স্বর্গীয় কালীনাথ নন্দী মহাশয়ের সহিত শ্রীহট্টে কোন পর্ব্বতে যাইয়া হাতীর খেদাও করিয়াছিলেন। ঐ সময়ে তিনি ব্রাহ্মসমাজ কর্তৃক প্রকাশিত ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকা পাঠ করিয়া ধীরে ধীরে পৌত্তলিকতার প্রতি তাঁহার বিরাগ জন্মে।
ব্রাহ্মধর্ম্ম গ্রহণ ও সর্ব্বধর্ম্মের আবির্ভাব :-
১২৭৪ কিংবা ১২৭৫ সালে ঢাকা পূর্ব্ববঙ্গ ব্রাহ্মসমাজ গৃহ প্রতিষ্ঠার সময়ে যথারীতি ব্রাহ্ম ধর্ম্মানুসারে তিনি দীক্ষা গ্রহণ করেন। এমনকি, ১২৭৬ বা ১২৭৭ সালের আশ্বিন মাসে নিজ বাড়ীতে প্রভুপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী প্রমুখ ব্রাহ্মবন্ধুদের সহিত মিলিয়া শারদীয় দুর্গোৎসব সময়ে পূজামণ্ডপেই কালীকচ্ছে সর্ব্ব প্রথম ব্রহ্মোৎসব করেন। অদ্যাপি উক্ত উৎসব গৃহ ‘ব্রহ্মমন্দির’ নামে পরিচিত। ব্রাহ্ম সমাজে অবস্থানকালে বাংলা ১২৮৩ সনে তাঁহার নিকট ‘দয়াময়’ নাম প্রত্যাদেশ বাণীরূপে অবতীর্ণ হয়। তিনি এই নাম লইয়াই সাধন করিয়া পরবর্তী কালে “সর্ব্বধর্ম্ম” প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করেন। সর্ব্বধর্ম্মতত্ত্ব, সর্ব্বধর্ম্মের বিশেষ তত্ত্ব ও জগতের ধর্ম্ম সম্বন্ধীয় সকল তত্ত্ব মীমাংসার বিশুদ্ধ গ্রন্থ ‘প্রকৃত তত্ত্ব’। এই গ্রন্থকে সর্ব্বধর্ম্মের সার গ্রন্থ বলা হয়। ১২৮৮ কিংবা ১২৮৯ সালে শ্রীমৎ আনন্দস্বামীজীর সমীপে ‘প্রকৃত তত্ত্বের’ সকল সত্য আবির্ভূত হয়। তিনি প্রত্যাদেশ বাণী বলিয়া দিতেন। তদীয় শিষ্য সর্ব্ব সাধক শ্রীযুক্ত কামিনীকান্ত ঘোষ মহাশয় তাহা লিপিবদ্ধ করিতেন। এই গ্রন্থে ৫৫টি বিষয় আলোচিত হইয়াছে। এই গ্রন্থ আদর্শ গ্রন্থ, ইহা-ই ‘দয়াময়’ নামের সার সম্পদ। তাছাড়া শ্রীমৎ আনন্দ মহারাজ কর্তৃক প্রণীত “সর্ব্বধর্ম্ম সাধন তত্ত্ব ও প্রণালী” “যোগ প্রণালী” ও “সর্ব্বধর্ম্ম গীত” নামক গ্রন্থ সমূহে সর্ব্বধর্ম্ম ও প্রকৃত তত্ত্বের ব্যাখ্যায়িত আছে।
শ্রীমৎ আনন্দস্বামীজীর জামাতা শ্রদ্ধেয় দ্বিজদাস দত্ত মহাশয় সর্ব্ব প্রথম কৃষি বিদ্যায় অধ্যয়নার্থে ইংলন্ডে গিয়াছিলেন। তিনি সেখানে কোন এক সভায় বক্তৃতাচ্ছলে প্রকৃত তত্ত্বের পান্ডুলিপি থেকে পন্ডিত গধী গঁষষবৎ এর নিকট কিছু তত্ত্ব বিবৃত করেন। তাহাতে গধী গঁষষবৎ সাহেব অতি বিস্ময়ের সহিত উত্তেজিত হইয়া বলিয়াছিলেন, “আশ্চর্য্যরে বিষয় জীবনাবধি অনন্ত বেদ শাস্ত্র অধ্যয়ন করিয়াও যাহা স্থির করিতে পারি নাই, অধীন ভারতে এখনও এতবড় দার্শনিক বর্তমান যাহার দুই চারটি কথাতেই আমার জীবনের সকল জটিল প্রশ্ন মীমাংসিত হইয়া গেল। এই কথা গধী গঁষষবৎ সাহেব নিজ গ্রন্থে লিখিয়াছিলেন ও চিঠি দিয়াছিলেন এবং শ্রদ্ধেয় দ্বিজ দাস দত্তকে বিশেষ কোন উচ্চ পদ প্রদান করিতে প্রস্তাব করেন। শ্রী দয়াল চন্দ্র ঘোষ সর্ব্বধর্ম্মাবতার শ্রীমৎ আনন্দ মহারাজের দেবদূর্লভ ও পবিত্র সঙ্গলাভ করিয়া তাঁহার বিশ্বাস সম্বন্ধে ক্রমে যাহা ব্যক্ত করিয়াছিলেন তাহার সারমর্ম :
১। একমাত্র অদ্বিতীয় জাগ্রত জীবন্ত ক্রিয়াশীল ও লীলাময় বিধাতা সর্ব্বকর্ত্তারূপে এই অনন্ত বিশ্বের সর্ব্বঘটে ক্রীড়া করিতেছেন। মানুষের কিংবা অন্য কোন জীবের ঈশ্বর ইচ্ছাকে অতিক্রম করিয়া স্বাধীনভাবে কোন কার্য্য করিবার ক্ষমতা নাই। মায়া মুগ্ধ মানব নিজকে কতিপয় কার্য্যওে কর্ত্তা বলিয়া অবলোকন করে। এই ভক্তি ভাবঈশ্বর ইচ্ছাতেই জগতে সকল মানুষের মনে বিচরণ করিতেছে। ইহাও ইচ্ছাময়ের জগত লীলার এক অঙ্গ, আবার তাঁহারই ইচ্ছাতে জগতে এই এক নিয়ম প্রবর্ত্তিত হইয়াছে যে, নাম সাধন ও ধ্যানাদি দ্বারা জীবাত্মা পরমাত্মার বাণী শ্রবণ ও তদ্দর্শন লাভ করিতে পারে। এইরূপ বাণী শ্রবণ ও দর্শন লাভ দ্বারা ঈশ্বরীয় যোগ লাভ হয় এবং তাঁহার সহিত যুক্ত অবস্থিতি করিয়া স্বীয় ও পরকীয় জীবনের ভূত ও ভবিষ্যৎ জানিতে পারে।
২। জগতের কোন ধর্ম্মই মিথ্যা নহে, সর্ব্বকর্ত্তা দয়াময়ঈশ্বর স্থান ও কালের উপযোগিতা মতে ঘট বিশেষকে উপলক্ষ করিয়া জগতে নানারূপ পূজাবিধি অর্থাৎ জীবাত্মা পরমাত্মার যোগ লাভ করিয়া শান্তি লাভ করিবার জন্য নানাবিধ প্রণালী প্রকাশ করিয়াছেন। এই সকল ধর্ম্ম প্রণালী অকিঞ্চিৎকর মানবজ্ঞানসম্ভূত নহে, সুতরাং কোন ধর্ম্মকেই অবহেলার চক্ষে দর্শন করা যাইতে পারে না। কোন ব্যক্তিও কাল বিশেষের জন্য অনাবশ্যক হইলেও অপর মানব সম্প্রদায়ের জন্য বিধাতার বিশেষ আবশ্যকীয় বিধান বলিয়া পরিগণিত। আলোক ও অন্ধকার, সুখ ও দুঃখ, পাপ ও পুণ্য এই দ্বৈতভাব ঈশ্বর ইচ্ছাতে ও তাঁহারই কর্ত্তৃতাধীনে জগতলীলা সম্পাদন করিতেছে। ঈশ্বরের যাহা ইচ্ছা নয় তাহা কখনই অস্তিত্ব যোগ লাভ করিতে পারে না।
৩। মানুষ সকল মরে না। কেবল আবশ্যকমতে কখন বা আবির্ভূত ও কখন বা তিরোহিত হয়। প্রয়োজন হইলেই জগতে প্রকাশিত হইয়া লীলা বিস্তার করে। যে সকল লোক মরিয়া গিয়াছে বলিয়া সকলে মনে করে, তাহারা সকলেই কোন সময় পূর্ব্বকার ও স্থূলদেহে পুনরায় জগতে উপস্থিত হইয়া পূর্ব্ব পরিচিতের সহিত পরিচয় ও জীবন মুক্তি লাভ করিবে। স্বামিজী মহারাজ এ সর্ব্বধর্ম্মের সাধনে সর্ব্বদা স্ত্রীযোগে কার্য্য করিতেন। তিনি নিজে যাহা দেখিয়াছেন ও পাইয়াছেন উহাই জনসমাজে রাখিয়া গিয়াছেন। তিনি উপদেশ করিয়াছেন, “যাহাতে স্ত্রীর সহিত সর্ব্বতোভাবে মিলিত হইয়া জীবন উন্নত করা যায় তাহাই প্রত্যেক সাধন ভজনের পূর্ণ আদর্শ ও একতার কারণ। তাহা না হওয়া পর্য্যন্ত কোন প্রকার সাধন দ্বারাই জীবনের আশা সফল করিতে পারিবে না।” অর্থাৎ “স্ত্রী ও পুরুষের যোগ সকলের মূল।” আনন্দ মহারাজ ‘দয়াময়’ নামকে সর্ব্বনাম বলিয়াছেন। ঈশ্বরের সকল প্রকার নামের যোগ এই নামেতে আছে। জাতিগত ও নামগত পার্থক্য এই দয়াময় নামেতে দূর হইবে এবং প্রকৃত প্রেম লাভ করিবে। সকলেই এই এক নামেতে দীক্ষিত হইয়া জীবনাশা সফল করিবে ও ভ্রাতৃ বিরোধ একেবারে দূর করিয়া দিয়া আনন্দ লাভ করিবে। তাঁহার মতে, “কোন ধর্ম্মাবলম্বীই বিপথগামী নহে।” সকলেই পথ চলিয়া যাইতেছে, সকলের উদ্দেশ্য এক। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্মের মধ্য দিয়ে প্রকৃত জ্ঞানের পথে আসিবে এবং সময়ে সকলে প্রেমযোগে মিলিত হইবে। সেই প্রেমযোগ দয়াময় নামেতে পূর্ণ হইবে। তাইতো আনন্দ মহারাজ গাইলেন, “শুনরে জগত জন, দয়াময় কর মনন, সর্ব্বযোগেতে মিলন হবে এই নামেতে”। সর্ব্বধর্ম্মের মূল লক্ষ্য জীবন মুক্তি। অনন্তকাল এই শরীরে পূর্ণ শান্তি ভোগ করার নাম জীবন মুক্তি। অর্থাৎ শরীরের সহিত পরমাত্মার ঐক্য হওয়ার নাম মুক্তি। সকলেই এই জীবন মুক্তির অধিকারী, কাহারও নিরাশ হইবার কারণ নাই। এই মুক্তি লাভ করার জন্য সকল মৃত মনুষ্য পূর্ব্ব শরীর নিয়া পুনরায় এই পৃথিবীতে আসিবেন। আনন্দ মহারাজ বলিয়াছেন, “মহামন্ত্র এই নাম জীবনে মুক্তির ধাম, সর্ব্বনাম প্রাণারাম মরা মানুষ আসবে ফিরে।” তিনি নিজেও বলিতেন, “আমি এই বাড়ীতে (কালীকচ্ছ) সকল ভান্ডার রাখিয়াছি। এই বাড়ীতেই অবতীর্ণ হইয়া আমি তোমাদিগকে দেখা দিব।” সত্যই, তাঁহার সাধন পূর্ণ হইলে তিনি সিদ্ধ দেহে আসিবেন ও জগতের কল্যাণকল্পে সত্য প্রতিষ্ঠা করিবেন। আনন্দ মহারাজের জীবন মাধুর্য্যভাবে পূর্ণ ছিল। তিনি সর্ব্বদা ঘৃণিত, নিপীড়িত, গলিত দুর্গন্ধময় দেহযুক্ত লোক দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকিতেন। তিনি সকলকে সমভাবে প্রেম বিতরণ করিয়াছেন। কাহাকেও দোষী কিংবা ঘৃণিত মনে করিয়া কখনও পরিত্যাগ করেন নাই। দীনতা ও সেবার ভাব জগতে বিশেষভাবে প্রচার করিয়া গিয়াছেন।
পরলোক গমন:-
শ্রীমৎ আনন্দস্বামীজির যখন ভবলীলা সংবরণের সময় নিকটস্থ হইতে লাগিল তখন তিনি তাঁহার শিষ্যদিগকে বলিতে লাগিলেন, “আমাকে আর অনেক দিন দেখিতে পাইবে না। এইখানেই অদৃশ্য হইয়া থাকিব।” কেহ কেহ এই বাক্যে অতিশয় ব্যাকুলতা প্রকাশ করিলে বলিতেন, “দেখিবে না, কোন কোন সময় দেখিতে পাইবে।” এই জগদ্বিখ্যাত মহাপুরুষ ১৩০৭ বাংলা সালের ১১ই জ্যৈষ্ঠ শুক্রবার রাত্রি প্রায় ১১ ঘটিকার সময় ভবলীলা সংবরণ করেন।