Notice Hotline:01787612121Visitor Count: 21731

শ্রী শ্রী মা মনোরমা দেবীর সংক্ষিপ্ত জীবন প্রবাহ

শ্রী শ্রী মৎ লব চন্দ্র পাল গুরু মহারাজের পত্নী সাধ্বী শ্রীশ্রী মা মনোরমা দেবী। তাঁহারজন্ম কাহিনী সম্পর্কে বিশেষ কোন তথ্য সংগ্রহকরা যায় নি। তবে তাঁহার মিশনে আগমন, বিবাহ, সাধনভজন, জীবনযাপন ও তিরোভাব সম্পর্কে বিভিন্ন গ্রন্থোক্ত সাধু সজ্জন মুখনিঃসৃত উক্তির যৎকিঞ্চিত আলোচনা করা হল: শ্রী শ্রী মা মনোরমা দেবী বর্তমান বাংলাদেশ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের কুমিল্লা জেলার বুড়িচং থানাধীন (উপজেলা) সুন্দ্রোম গ্রামের এক সুখ্যাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শ্রী মায়ের জম্ম ৪ ঠা অগ্রাহায়ন ১৩৩০ বঙ্গাব্দ রোজ মঙ্গল বার সকাল ৫ টা ১০ মিনিটে । শ্রী মায়ের বাবার নাম ঁকামিনী কুমার দাস, মাতার নাম ঁউজ্জলতা দাস। পিতা-মাতা আদর করে মানদা বলে ডাকতেন। শ্রী মায়ের জম্মের কিছু কাল পর তাঁর পিতা- মাতার মৃত্যু ঘটে, এরপর থেকে শ্রী মায়ের শৈশব কাল অতিবাহিত হয় জিয়াপুর মাতুলালয়ে। মামা প্রসন্ন কবিরাজের বাড়ীর পাশেই পাঠশালা, মা পাঠশালাতে গভীর মনোযোগের সহিত অধ্যয়ন করতেন। পাঠশালার পন্ডিতেরাও তাঁকে মনে প্রাণে ভালবাসতেন। মা সুশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন।তাঁর হস্তাক্ষর খুবই সুন্দর ছিল। ভক্ত শিষ্যদের নিকট মা নিজেই পত্র দিতেন।মাতৃদেবী সুরেলা কণ্ঠের অধিকারিণী ছিলেন। সঙ্গীতের প্রতি ঝোঁক দেখে তৎকালীন সময়ের অন্যতম সঙ্গীত শিল্পী রাইমোহন দাস (মাস্টার) মহাশয়কে মায়ের সঙ্গীত শিক্ষায় দায়িত্ব দেওয়া হল। অচির কাল মধ্যেই মাতৃদেবী সঙ্গীতে পারদর্শী হয়ে উঠেন। মাতৃদেবী অসংখ্য গুণে ভূষিত ছিলেন। তিনি সাক্ষাৎপূর্ণ লক্ষী ছিলেন। মিশনরাজ্যে শ্রী শ্রী মায়ের শুভাগমনের পূর্বেই এক উপাসনাতে দৈব বাণী প্রকাশিত হইয়াছিল“মনোরমা নামে একটি মেয়ে এই মিশনে আসিলে মিশনের দুর্দিন সুদিনে পরিণত হইবে। এই মেয়ে মিশনে আসিলে মিশনরাজ্যের অভাবচিরকালের জন্য দূরী ভূত হইবে।” কিন্তু মনোরমানামে মেয়ে পাওয়া যাইবে কোথায়? চারদিকে খোঁজা খোঁজি আরম্ভ হইল। শেষে শ্রী গুরুর এক প্রিয় শিষ্য স্বপ্নাদেশ পাইল "দক্ষিণ দেশে জিয়াপুর গেলে এই মেয়ের সন্ধান পাইবি” পরদিন অনেক লোক জিয়াপুর গ্রামে দিয়া‘মনোরমা’নামে মেয়ের সন্ধান পাইল। কিন্তু তাঁহাদেও সাথে তৎক্ষণাৎ এই মেয়ে মিশনে আসিল না। গুরুমহারাজকে এই খবর অবহিতকরার পর তিনিধ্যানস্থ হইয়াকি যেন চিন্তা করিয়া নিলেন। ত্রিকালদর্শী মহাপুরুষ যাহা সত্য তাহাই জানিলেন। কিছুদিন পর শ্রীশ্রী গুরুমহারাজ জিয়াপুরগমন করিলে এই মেয়ের সাক্ষাৎপাইয়া ছিলেন। তাহারও অনেকদিন পরে ঘটনাচক্রে ‘মনোরমা’নামের ঐ মেয়ে মিশনরাজ্যে প্রবেশ করিতেবাধ্য হইয়া ছিলেন। বাস্তবিক দেখা গেল ১৩৪৭ বাংলাসনে মনোরমা নন্দী ও শৈলজা সেননামীয় দুইজন ভদ্রমহিলা তাঁহাদের স্বামীর সংসারের বিপর্যয়অবস্থায় পড়িয়া অনন্যো পায় হইয়া একই সময়ে মিশনের শরণাপন্ন হইলেন। শ্রী শ্রী কর্ত্তামহারাজ তাঁহাদের জীবনের দুরবস্থার কথা অবগত হইয়া তাঁহাদিগকে মিশনে আশ্রয় দান করিলেন। তখন হইতে তাঁহারা মিশন সভ্য শ্রেণীভুক্ত হইয়া যথারীতি মিশনে কার্য্য সম্পাদন ও সাধন ভজন করিতে লাগিলেন। মিশনে ‘মনোরমা’ নন্দী এই মেয়েটি একান্ত নিষ্ঠবতী নারী হিসাবে পরিচিতি লাভ করিল। তাঁহার চরিত্রে অনন্য সাধারণ গুণা বলীর সমাহার ছিল। মিশন বাড়িতে রন্ধন কার্য্যরে ভার তাঁহার উপরছিল। সময় সময় দিবা নিশি রান্না করিতে হইত। কিন্তু কোন দিন তাঁহার মাঝে ক্লান্তি ও বিরক্তির ভাব দেখা যাইতনা। হাসি মুখে নিজ দায়িত্ব পালনকরিতেন। এই ভাবে তিন বৎসর অতি বাহিত হইল।এই ভাবে তিন বৎসর অতিবাহিত হইল। ১৩৫০ বাংলা সালের ২১ আষাঢ় দয়াময়ের প্রত্যাদেশ পাইয়া শ্রী শ্রী কর্ত্তামহারাজ শেষ অবধি এই মনোরমা দেবীকে সর্ব্বধর্ম্মানুসারে পত্নী রূপে গ্রহণ করেন। তখন হইতেই মনোরমা দেবী আমাদেও মিশন জননী হিসাবে সম্বোধন পাইতে লাগিল। ধীরে ধীরে মিশনের কাজও বাড়তে লাগিল। মাতৃদেবী সাধন-ভজন, উপাসনা, লোকজনের তত্ত্ব বিধানে নিজেকে নিয়োজিত করিলেন। গুরু মহারাজ যেখানেই যাইতেন মাকে সঙ্গে নিয়া চলিতেন, এমনকি উপাসনার সময় মা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকিলে গুরু মহারাজ মাকে পাশে বসাইয়া তারপর উপাসনার কাজ আরম্ভ করিতেন। মা ছাড়া যেন মিশনের সকল কার্য্যে তখন অভাব থাকিয়া যাইত।তাঁহার জীবন মিশনের জন্যই গঠিত হইয়া ছিল। মিশনের উদ্দেশ্য ও কার্য্যাবলী সম্পাদনে মিশনকে শক্তিশালী করিতে জগত মাতা স্বয়ং মা মনোরমা দেবী নামে ধরাধামে আবির্ভূতা হইয়াছিলেন। গুরু মহারাজের মহাপ্রয়াণের পর মাতৃদেবী সর্ব্ব ধর্ম্ম মিশনের ধনবল, জনবল ও সাধনবলবৃদ্ধি ও জগদ্বাসীর জীবন্মুক্তির মহামন্ত্র ‘দয়াময়’নাম প্রচারের সংগ্রামে অবতীর্ণ হন। তিনি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলার মিলনসংঘ এলাকায় ‘দয়াময়’ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করিয়া এক দিকে কঠোর সাধনেব্রতী হইলেন এবং অন্যদিকে দয়াময় নাম প্রচার কল্পে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন স্থানে আশ্রম প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করিলেন। তিনি অত্যন্ত ধৈর্য্যশীলা ছিলেন। স্বল্পবাক মায়ের জীবনে যতই সঙ্কট আসিত তিনি স্বাভাবিক ঘটনা বলেই গ্রহণ করিতেন। এত বড় আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারিণী হইয়াও তাঁর বাহ্যিকপ্রকাশ বিন্দুমাত্র ছিল না। তিনি বলিতেন, “ক্ষণস্থায়ী জীবনে সংগ্রাম করাই শ্রেয়।” সাধারণ বেশে সংসারে থাকিয়া কি অসীম শক্তির অধিকারী হওয়া যায় তা মাকে না দেখলে এবং তাঁর জীবনের কার্য্য কলাপ পর্যালোচনা না করিলে বুঝা কঠিন। জীবনের শেষ পর্যায়েও তিনি মিশনের উন্নতি বিধান কল্পেই চিন্তায় ব্যস্ত থাকিতেন। তাঁর অসীমসাধনা ও কৃপায় তখন বাংলাদেশ ও ভারতে বহু আশ্রম ও সংঘপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। তিনি উভয় দেশের দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরিয়া ঘুরিয়া‘দয়াময়’নাম ঘরে ঘরে পৌছে দেওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করিয়া ছিলেন। তিনি জগত গুরু শ্রী মৎ লব চন্দ্র পালের পূর্ণ সঙ্গিনী ছিলেনএবং দুই জনেই মিশনের উদ্ধার কল্পে জীবন উৎসর্গ করিয়া ছিলেন। তিনি জীবনের শেষ পর্যায়ে গভীর ধ্যানেনিমগ্ন থাকিতেন। স্বল্পাহার করিতেন এবং খুব কম কথাবলিতেন। ৬ই আষাঢ় ১৪০৩ বঙ্গাব্দ রোজ শুক্রবার শ্রী শ্রী গুরুমাতা ঠাকুরাণীর মহাপ্রয়াণ ঘটে। তাঁর মহাপ্রয়াণে সমস্ত মিশন জগৎ স্বজনহারা শোকেবিহবল হয়ে পরেন। কিন্তু ভয় নেই,মিশন প্রেমীদের হৃদয়ে মা সর্বদা রয়েছেন।