শ্রী শ্রী জয়দুর্গা দেবীর সংক্ষিপ্ত জীবন প্রবাহ :
সর্ব্বধর্ম্মাবতার শ্রীমৎ আনন্দস্বামিজীর সহধর্মিনী এবং জগত উদ্ধার কল্পে পিতার পূণ সঙ্গিনী হয়ে জগত মাতারূপে অবতীর্ণ শ্রী শ্রী জয়দুর্গা দেবী বেজুরা গ্রামনিবাসী স্বর্গীয় কাশীনাথ চৌধুরী মহাশয়ের ঔরসে লালিত পালিত হন। তাঁহার শরীরের রং কালো ছিল। কিন্তু তাঁহার দৈহিক গঠন এবং নয়নাতন সকলের ভক্তি আকর্ষণকরিত। তিনি খুবই পতিব্রতা ছিলেন। স্বামীকে প্রাণাপেক্ষা প্রিয় ভাবিতেন, তিনি যে দিন স্বামীর তিরোধান হয় শুনিয়াছিলেন, সেই দিন হইতে জলও গ্রহণ করেন নাই। তিনি স্বামীর সঙ্গে সঙ্গে উপবাস করিতেন, উপদেশ শুনিতেন ও পাক করিতেন। বেহানেশয্যা হইতে উঠিয়া হাত-মুখ ধুইতেন। উপাসনারকালে স্বামীরপাশে আসনস্থা হইয়া ধ্যানেমগ্ন হইতেন। তিনি যেমন ভাবে ধ্যান করিতেন তাহার তুলনা ছিল না, সারা শরীর মন কাহার অন্বেষণে যেন কোথায় নিরুদ্দেশ হইয়া যাইত। দিনের বেলা আর কিছু খাইতেন না-পানের বাটা থাকিত। পাক করিতে করিতে গাছতলার সকল দেবতারকথা, মহাপুরুষের কথা, পুরাণ-ভাগবতের কথা শ্রবণ করিতেন। এমনকি দুপুরের রোদে গাছতলার ঘাটে স্নানের জন্য নামিতে নামিতে গান ধরিতেন। সাধন পথেও নাকি তাঁহার খুব উন্নতি হইয়াছিল। যেমন ঈশ্বরের নাম এবং দয়াময়রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিতে শ্রী আনন্দের জন্ম হইয়াছিল তেমন তাঁহারিসহ-ধর্ম্মিণী হইয়াই মা জন্মিয়া ছিলেন। উভয়ের পার্থক্য ছিল না। মা বাড়ীতে থাকিতেন-বাবা বর্ষা আসিলে শিষ্যদেরে দেখিতে যাইতেন; তিনি চাতকীরমত উদাস প্রাণেদিন কাটাইতেন এবং বাবা আসিয়াছেন শিষ্যদের কেহ আসিয়া খবর দিলে, মুখেরহাস্য ভঙ্গিতেই হৃদয়ের অফুরন্ত আনন্দ ঢালিয়া দিতেন। সময় সময় শ্রী শ্রী জয়দুর্গা দেবী নিজে-ই উপাসনারকার্য্য করিতেন। নিম্নে তাঁহার একটি উপাসনা “সর্ব্ব ধর্ম্ম সাধন তত্ত্ব ও প্রণালী” হইতে উদ্ধৃত করা হইল:-
১১ই ভাদ্র, মঙ্গলবার, ১২৯১ সাল
“হে ঈশ্বর করুণাময় দীনবন্ধু!নামকীর্ত্তন কিছুই জানি না, দয়াময় নিজগুণে কৃপা করে উদ্ধার কর। আমি কেমন করে ডাকিব? তুমি দুর্ব্বলের বল, তুমি দুর্ব্বলের গতি, এই ভরসাতে তোমারদ্বারেতে আসিয়াছি, তোমার নামকীর্ত্তন করিতে পারি, দীনবন্ধু, তুমি এই আশীর্ব্বাদ দাও। তুমিও নিকটে-ই রহিয়াছ, কেন যে দেখিতেছি না দীনবন্ধু কেন আমি তোমার উপলব্ধি করিতে পারিনা? দীনবন্ধু আমি কেমন করিয়া তোমাকে ডাকিব? হে দুর্ব্বলের বল তুমি সেই বল দিবে। তুমি যা বলাবে তাই বলব। আমার জ্ঞান নাই, বুদ্ধি নাই, আমি যে উপলব্ধি করিতে পারি। মা, এই নামের গুণে কি হইতে পারে? তোমাকে দেখি, তোমাকে ডাকি, তোমাকে মস্তকে ধারণ করি, তোমার চরণতলে পড়িয়া থাকি, দীনবন্ধু এই আমার আশা। তোমার নাম কীর্ত্তন করিয়া তাপিত হৃদয়শীতল করিতে পারি; তুমিও হৃদয়েইআছ, তুমি ভক্তের কাছেইআছ। তুমি হৃদয়ে দৃষ্টি করিলে তুমি হৃদয়েইআছ। তুমি অন্তরে বাহিরে সকল স্থানে সকলের মধ্যে বর্ত্তমানআছ। তোমার এই সৃষ্টি, তোমাছাড়াকি এক তিলও থাকা যাইতে পারে? যেখানে যাই সেখানেই তুমি। দীনবন্ধু তোমার কত সাধক ভক্ত, মহাজন তোমার নামেরর সে মুগ্ধ হইয়ারহিয়াছে। আমাদেরকিদিব্য চক্ষু হবে? তোমাকে দেখিতে পাইবনা? তোমার সকল সন্তানইত সমান, ভক্ত সন্তানদিগকে যেরূপ রাখিতেছ, জন্মান্ধগুলিকেও সেইরূপ রাখিতেছ- পথ হারা হইয়া যাইবেনা। আমার পক্ষেও তুমিআছ। একবারওকি দৃষ্টিকরনা? আমরা কাটাশত ভাঙ্গিয়া ঘুরিতেছি। কেন তোমার বাক্যকে অগ্রাহ্য করিয়াছি। আমাদিগকে কে ডাকিতেছেন, দয়াময়আমাদের সেইবলনাই, সেই জ্ঞান নাই, কেন না পাপের বাক্য শুনিয়াছি। পাপ আমাদিগকে ঘুরাইতেছে। দীননাথ যদি হাতে ধরিয়ানা নেও তবে সন্তান বাঁচেনা। হে প্রাণের প্রাণ জীবনের জীবন তুমি কেশে ধরিয়া টানিয়ানেও। আর কুপথগামী হইতে দিওনা। ধরিয়া বাধিয়া রাখ। পিতার কি পুত্র-কন্যাদিগকে ছাড়িয়া দিতে হয়? ধরিয়া রাখিতে হয়। তুমি তোমার মধুরবাক্য দেও। তুমি পাপী ও তাপীর পিতা-মাতা। কাঙ্গাল দেখে দয়া কর দীন দয়ালতুমি কৃপা কর, আর যেন তোমার নিকট হইতে দূরে না যাই। দীননাথ প্রভো, তোমারভাব যেন ছাড়িয়া না থাকি। তোমাকে হৃদয়ে লইয়া ও বসাইয়া এই জীবনের সময়টুকু যেন যাপন করি- সংসারে শান্তি পাই।”
>>> জয়ধ্বনি <<<
মা লেখা পড়া জানিতেন না। কিন্তু তাঁহার হৃদয় জগতের জন্যই গঠিত হইয়া ছিল-জগতের জন্যই তাঁহার জন্ম হইয়া ছিল। তিনি সহ ধর্ম্মিণীরূপেই স্বামীর সহিত সাধন ভজন করিতেন। স্বামীরমৃত্যুর দুইদিন গেলে নিজেও তাঁহার অনুগামিনী হন। তিনি ১৩০৭ সনের ১৪ই জ্যৈষ্ঠ রাত্রি ৮ ঘটিকার সময় বাহ্য ভবলীলা সংবরণ করিলেন।